বট সাবিত্রীর ব্রতকথা -
বহু প্রাচীন কালে মদ্রদেশে অশ্বপতি নামে এক রাজা ছিল।এই রাজার পুন্যের ফলে একদিন দেবর্ষি নারদ তার রাজসভায় এসে উপস্থিত হলেন।সে সময় রাজা অশ্বপতি খুব চিন্তিত ছিলেন।নারদ রাজাকে তার চিন্তার কারন জিজ্ঞাসা করলেন। রাজা বলিলেন আজ কিছুদিন হলো মন্ত্রী ও সৈন্য সামন্তদের সঙ্গে দিয়ে দেশ ভ্রমণে পাঠিয়েছিলাম কিন্তুু কোনো খবর না পাওয়ায় খুব চিন্তা হচ্ছে।নারদ তখন বললেন কিন্তু ু মা সাবিত্রীর বিয়ের কি ব্যবস্থা করলেন মহারাজ রাজা অশ্বপতি দীর্ঘ নিশ্বাশ ফেলে বলল সাবিত্রীকে বিয়ে করার জন্য অনেক দেশের অনেক রাজপুত্র এসেছিল কিন্তু সাবিত্রীকে দেখার পর কেউ তাকে স্ত্রী হিসাবে গ্রহণ করতে সাহস করলেন না। সকলেই ফিরে গেলেন। নারদ বললেন তাতো হবারই কথা মহারাজ তোমার কি মনে যে কোন দেবীশক্তি থেকে সাবিত্রীর জন্ম রাজা বললেন হ্যাঁ মনে তো আছে দেবর্ষি জৈষ্ট্য মাসের কৃষ্ণা চতুর্দশীতে ব্রত করে আমি সাবিত্রীকে পেয়েছি। এমন সময় মন্ত্রী রাজসভায় এসে রাজাকে জানালেন যে মা সাবিত্রী ফিরে এসেছেন। মন্ত্রী বললেন দেবর্ষি আমরা বহু দেশ আর বহু নগর পরিভ্রমন করে এসেছি।বহুরাজা মহারাজা মা সাবিত্রীকে দেখে খুবই মুগ্ধ হয়েছেন কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এই যে মা সাবিত্রীর বর সহজে কোথাও খুজে পাওয়া যায়নি।শেষে অন্ধ রাজা দ্যুমৎসেন তার রাজ্য হারিয়ে যে বনে বাস করছেন আমরা সেখানে গিয়ে উপস্থিত হই। মা সাবিত্রী রাজরানীর কাছে আদর পেয়ে খুবই মুগ্ধ হন আর শেষে তাদের এক মাত্র ছেলে সত্যবানকে তার স্বামী হিসাবে মনোনীত করেছেন। নারদ মন্ত্রীর শেষ কথাটা শুনে চিন্তিত হয়ে উঠলেন এবং বলেলেন মা সাবিত্রী ভাল কাজ করেনি। সত্যবান রাজপুত্র হলে কি হবে তার আয়ু যে খুবই কম।সত্যবানের সঙ্গে বিয়ে হলে এক বচ্ছর পরেই সাবিত্রীকে বিধবা হতে হবে। রাজা অশ্বপতি নারদের এই কথা শুনে তখনই সাবিত্রীকে সভায় ডেকে আনলেন এবং বললেন মা সাবিত্রী তুমি তোমার মত পরিবর্তন করো মা। দেবর্ষির মুখে শুনলাম যে সত্যবানের আয়ু খুবই কম।তার হাতে তোমাকে বিয়ে দিলে বৈধব্য যন্ত্রণা ভোগ করতে হবে আমি তা দেখতে পারবো না তুমি তোমার মত পরিবর্তন কর মা।রাজার মুখে এই কথা শুনে সাবিত্রী শিউরে উঠলো আর অপলক চোখে রাজার দিকে চেয়ে রইল। রাজা তখন সাবিত্রীকে বুঝিয়ে বললেন মা তুমি তো সত্যবানকে শুধু মনে মনেই স্বামী বলে মনোনীত করেছ।তোমার এই মত পরিবর্তন করতে ভাববার কি আছে মা বিয়ে স্থির হয়েও তো অনেক সময় ভেঙে যায়।সাবিত্রী বলল বাবা আপনি নিজে আমাকে আমার মনোমত স্বামী বেছে নেবার অনুমতি দিয়েছেন। সেই মতো আমি সত্যবানকে বেছে নিয়ে তাকেই মনে মনে স্বামী বলে স্বীকার করে নিয়েছি এখন অন্য কাওকে বরন করলে আমাকে দ্বিচারিনী হতে হবে না কী?রাজা অশ্বপতি সাবিত্রীর এই কথা শুনে আর কোনো কথা বলতে পারলেন না। দেবর্ষি নারদ তখন বললেন বৃথা চিন্তা করে লাভ নেই রাজা তুমি সত্যবানের সঙ্গেই সাবিত্রীর বিয়ে দাও। আমি সাবিত্রীর কুষ্টি দেখেছি তাতে সাবিত্রীর বৈধব্য যোগ নেই।অথচ সত্যবানের অকালমৃত্যুর যোগ রয়েছে।এটাও আমি জানি হয়তো এরমধ্যে কিছু রহস্য আছে। যায় হোক এই বিয়েতে মত দেওয়া ছাড়া তোমার আর কোনো গতান্তর নেই।রাজা অশ্বপতি নারদের কথা ঠেলতে পারলেন নাই। রাজা দমুৎসেনের সঙ্গে দেখা করে সত্যবানের সঙ্গেই সাবিত্রীর বিয়ে দিয়ে দিলেন। রাজা দমুৎসেন ও রানী সাবিত্রীকে বউ পেয়ে খুবই খুসি ও আনন্দিত হলেন।সাবিত্রীও খুব যত্নের সঙ্গে শ্বশুর শাশুড়ির সেবা করতে লাগল। এই করে ক্রমে এক বছর পুর্ন হতে চলল।সাবিত্রী সারা বছর ধরে দিন গুনে আসছিল। এখন বছর পুর্ন হবার তিন দিন আগে শ্বশুর শাশুড়ির কাছে অনুমতি নিয়ে সাবিত্রী ব্রতের উপোস করতে আরম্ভ করল।যে দিন এক বছর পুর্ন হবে সেই দিন পড়ল জৈষ্ঠ মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশী তিথি। 💖
যখন সত্যবান কাষ্ট আনিবার জন্য বনে গমন করিবার জন্য উদ্যৎ হইল তখন সাবিত্রী শশুর ও শাশুড়িকে বুঝাইয়া স্বামীর সহিত সাবিত্রিও বনে গমন করিল । বনে গিয়ে সত্যবান কাঠ সংগ্রহ করিতে লগিল
হটাৎ সত্যবানের মাথায় অসহ্য যন্ত্রণা হতে লাগল।সত্যবান সাবিত্রীকে বলল
সাবিত্রী আমার মাথায় অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে আমাকে ধর।
বলতে বলতে সত্যবানের শরীর ঠান্ডা হতে লগল সাবিত্রী সত্যবানের মস্তক কোলের মধ্যে নিয়ে বসে পড়ল মাটিতে।
কখন যে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল জানতেও পারল না। সেদিন ছিল কৃষ্ণাচতুর্দশী তিথি।
একাকিনী সাবিত্রী সত্যবানের দেহ কোলে নিয়ে মাসাবিত্রী দেবীকে স্মরন করতে লাগিল। যমদুতেরা এসে সতীসাবিত্রী দেখে ভীত হয়ে ফিরে গেল যমরাজের কছে এবংবলল প্রভু এক দেবী মৃতদেহ কোলে নিয়ে বসে আছে গভীর জঙ্গলের মাঝে।
এই বার্তা শুনে যমরাজ নিজে গিয়ে উপস্থিত হলেন এবং সাবিত্রীকে বলল
দেবী তোমার স্বামী মৃত।এখন আমি তোমার স্বামীর প্রানপুরুষটি নিতে এসেছি। তুমি সত্যবানের দেহটা মাটিতে রেখে বাড়ি ফিরে যাও আমি এর প্রানটি নিয়ে চলে যায়।সাবিত্রী দেহটা মাটিতে রেখে সরে দাঁড়াল যমরাজ সত্যবানের প্রানটি নিয়ে দক্ষিণ দিকে চলতে লাগল।কিছদুর যাওয়ার পর যমরাজ দেখলযে সাবিত্রীও তার পেছনে পেছনে আসছে,তা দেখে যমরাজ বলিল হে দেবী তুমি আমার সহিত কোথায় চলিয়াছ।🙏
ধর্মরাজ যমের কথা শুনিয়া সাবিত্রী বলল আমার স্বামী কে যেখানে নিয়ে যাবেন আমিও সেখানে যাইব। কারণ পতিই সতির ধর্ম ও আশ্রয় আপনি ধর্মরাজ নিশ্চই এই কথাটি জানেন। ধর্মরাজ যম কথাটি শুনে লজ্জিত বোধ করলেন। যম সাবিত্রীকে বলল সতী তুমি তিনটি বর চাও । সত্যবানের জীবন ছাড়া। আমি সেই বর তোমাই দেব। সাবিত্রি বলল আপনি যদি সত্তি আমার উপর সন্তুষ্ট হয়ে থাকেন তাহলে এই বর দেন যেন (1) আমার অন্ধশ্বশুর আর অন্ধ শাশুড়ি তাদের দুই চোখের দৃষ্টি যেন ফিরে পায়।
(2) আমার শশুর মশাই যেন তার রাজ্য পুনপ্রাপ্ত করেন(3)আমার পিতার একশোটা পুত্র লাভ হউক।
তথাস্ত বলিয়া ধর্মরাজ যম গমন করিলেন।
এদিকে সাবিত্রী ও যমের পেছনে পেছনে গমন করিতে লাগিল অবশেষে বৈতরণী নদীর তীরে উপস্থিত হইল যম সাবিত্রীকে দেখিয়া বিস্মৃত হয়ে গেল।ধর্মরাজ যম বলিল দেবী তুমি এখনো পর্যন্ত আমার সঙ্গে।সাবিত্রি পুনরায় ধর্মরাজের স্তব করিলেন। ধর্মরাজ সন্তুষ্ট হয়ে বলল। তুমি আরো একটু বর চাও।
সাবিত্রী বলিল -আমাকে এইবর দিন যেন সত্যবানের ঔরসে আমার এক শটি পুত্র লাভ হয়। যমরাজ তথাস্তু বলিয়া তাড়াতাড়ি চলিতে লাগলো এবং খুব তাড়াতাড়ি বৈতরনীর তীরে এসে উপস্থিত হল।
পেছনে সাবিত্রীকে দেখে চমকে উঠলো
যমরাজ সাবিত্রী কে বলল মানুষ এখান পর্যন্ত আসতে পারে না তুমি কি করে এলে? সাবিত্রী বলল যে ধর্মরাজের আশ্রয় নিয়েছে সে এমন কোন জায়গা নেই যেখানে যেতে পারেনা।কিন্তু আমি একটা কথা জানার জন্য এতদূর পর্যন্ত আপনার সাথে এসেছি আপনি আমায় শত পুত্রের জননী হওয়ার বর দিয়েছেন অথচ আমার স্বামীকে নিয়ে চলে যাচ্ছেন ধর্মরাজও কি ধর্ম কথা ভুলে গেছেন। সাবিত্রীর কথা শুনে ধর্মরাজ লজ্জিত হয়ে সত্যবানের প্রাণপুরুষকে ফিরিয়ে দিলেন। এরপর সাবিত্রী সত্যবান এর প্রাণপুরুষ নিয়ে ফিরে এসে সত্যবানের জীবন দান করলেন। সত্যবান ঘুমের থেকে উঠে বসে সাবিত্রী কে বলল চলো আমরা বাড়ি ফিরে যাই।এদিকে শশুর শাশুড়ি দুজনায় সকালে উঠে চোখে দেখতে পায়। এবং সকাল হয়েছে দেখে সাবিত্রী সত্যবান কে না দেখতে পেয়ে চিন্তা করছিল এমন সময় সাবিত্রী সত্যবান এসে উপস্থিত হল তাদের সামনে। এদিকে মন্ত্রীসৈন্যসামন্ত নিয়ে রাজার কাছে এসে উপস্থিত হলো আবার রাজা নিজের রাজত্বে ফিরে গেলেন। সত্যবানকে রাজ সিংহাসনে বসিয়ে আনন্দে দিন জাপন করতে লাগলেন।
সাবিত্রী সত্যবানের জয় হোক।
বলো বলো সাবিত্রী সত্যবান কি জয়।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন